এক. ‘মিতা’ হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ একটা লেখা
লিখেছিলেন। সেই লেখার শুরুর অংশে লেখক হুমায়ূন তৎকালীন দৈনিক বাংলার সহ-সম্পাদক
সালেহ চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, “তিনি (সালেহ চৌধুরী) আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায়
উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘বাংলাদেশে পাঁচজন হুমায়ুন আছে। দৈনিক বাংলায় এদের ছবি একসঙ্গে
ছাপা হবে। আমি একটা ফিচার লিখব, নাম পঞ্চ হুমায়ুন।’ আমি বললাম, ‘পাঁচজন কারা?’ সালেহ চৌধুরী বললেন, ‘রাজনীতিবিদ হুমায়ুন
রশীদ চৌধুরী, দৈনিক বাংলার
সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুন, অধ্যাপক-কবি হুমায়ুন আজাদ, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং তুমি (হুমায়ূন
আহমেদ)।’’ ট্র্যাজিক বিষয়
হচ্ছে বর্তমানে পাঁচ হুমায়ুনের একজনও বেঁচে নেই।
দুই. ফরীদি মঞ্চে শেষবারের মতো অভিনয় করেন ১৯৯২ সালে। অনেকে জানেন, মঞ্চে নাটক করা তার
পছন্দ ছিল না। তবে তিনি মঞ্চের তুখোড় অভিনেতা এটা কেউ অস্বীকারও করবেন না। মঞ্চে
ফরীদির আনুষ্ঠানিক যাত্রা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃনাট্য প্রতিযোগিতার
মধ্য দিয়ে। সেখানে নিজের লেখা নাটক ‘আত্মস্থ ও হিরণ্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নির্দেশনা দেন ও
অভিনয় করেন। নাটকটি সেরা নির্বাচিত হয়। সে সুবাদে পরিচয় ঘটে ঢাকা থিয়েটারের নাসির
উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে।
তিন. সিরিয়াস টাইপের রসিকতা করতে পারঙ্গম ছিলেন ফরীদি। এক সাংবাদিকের
সঙ্গে তার কথোপকথন ছিল অনেকটা এ রকম—
‘চলচ্চিত্রে কিভাবে
এলেন?’
‘পরিচালক খোকনের (শহীদুল ইসলাম খোকন) সাথে।’
প্রশ্নকর্তা শুধরে বললেন, ‘না মানে এফডিসিতে কিভাবে এলেন?’
ফরীদির উত্তর, ‘বেবিট্যাক্সি করে।’
‘পরিচালক খোকনের (শহীদুল ইসলাম খোকন) সাথে।’
প্রশ্নকর্তা শুধরে বললেন, ‘না মানে এফডিসিতে কিভাবে এলেন?’
ফরীদির উত্তর, ‘বেবিট্যাক্সি করে।’
চার. শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’ সিনেমার মাধ্যমে
খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় শুরু তার। বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ককে ভিন্ন রকম উচ্চতায়
নিয়ে গিয়েছিলেন ফরীদি। তার সিনেমায় নায়কের চেয়ে খলনায়কের প্রতিই দর্শকের
আকর্ষণ ছিল বেশি।
পাঁচ. ফরীদির
প্রথম টিভি নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর ‘নিখোঁজ সংবাদ’। মজার বিষয় হল এ নাটকে তিনি প্রথমে অভিনয় করতে চাননি। কারণ
স্ক্রিপ্ট পছন্দ হয়নি! একটি চ্যানেলের ওই যুগে বড় বড় অভিনেতারাও কোনো চরিত্রে
অভিনয়ে মানা করার আগে দশবার চিন্তা করতেন!
ছয়. অভিনয়ের
প্রথম দিকে ১০ বছর পর্যন্ত ফরীদি চাঁদপুর কর্পোরেশনে চাকরি করতেন। শুধু অভিনয় করে
জীবন ধারণ সম্ভব ছিল না বলেই চাকরিটা ছাড়তে পারেননি। এ ছাড়া আরও কয়েকটি
প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছিলেন তিনি।
সাত. দেশ
সম্পর্কে ফরীদি বলতেন, ‘দেশটা আরও সুন্দর হতে পারত’। মুক্তিযুদ্ধ তার মাঝে আশাবাদের বীজ বপন করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ
নেওয়ার কারণে ৫ বছর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ছেদ ঘটে। পরে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আট. ফরীদি
দিনে ৪-৫ বার ভাত খেতেন। এর পেছনে যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি আসলে
অল্প আহার করেন। মানুষ তিনবেলায় যা খায়, তিনি অল্প
অল্প করে ৪-৫ বারে তা খেতেন। তবে সবসময় যে ভাত খেতেন তা ঠিক নয়। আইটেম হিসেবে
রুটি, সবজিও খেতে পছন্দ করতেন ফরীদি।
নয়. তাকে
প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘ফরীদি’ বানান নিয়ে।
তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ফরীদি’ লেখা সহজ বলেই
তিনি শব্দটি এভাবে লেখেন। এ ছাড়া বিশেষ কোনো কারণ নেই। তার মায়ের নাম ছিল ফরিদা
ইসলাম, সেখান থেকেই তার নামকরণ হয়েছে।
দশ. হুমায়ুন
ফরীদির অনেকগুলো ডাকনাম। এর মধ্যে অন্যতম পাগলা, সম্রাট ও
গৌতম।
এগারো.
হুমায়ুন ফরীদি ‘মৃত্যু’ নিয়ে বলতেন, মৃত্যু একটি ভয়ংকর সুন্দর ব্যাপার। কারণ মানুষের মনে মৃত্যুভয়
থাকলে কেউ কখনও পাপের চিন্তা করতে পারে না। এখানেই মৃত্যুর সৌন্দর্য।
বারো. কথায়
কথায় কৌতুক করতেন তিনি। তবে ফরীদি স্পর্শকাতর বিষয়-আশয় নিয়ে কৌতুক করতে পছন্দ
করতেন। তার বন্ধু-মহলে এ্যাডাল্ট কৌতুকই বেশি বলতেন। সবাই হেসে মরে যাবার উপক্রম
হলেও তিনি কখনোই হাসতেন না। আরেকটি বিষয় তিনি প্রায়ই করতেন। কাছের মানুষদের ভূতের
ভয় দেখানো। এ কাজটা সফলভাবে করতে পারতেন।
তের. তরুণকালে
বেলি ফুলের মালা দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে মিনুকে বিয়ে করেছিলেন ফরীদি। ব্যতিক্রমী এ
বিয়ের ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। দেবযানি নামে এই দম্পতির একটি মেয়ে রয়েছে।
পরে ফরীদি ঘর বাঁধেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে। ২০০৮ সালে তাদের
বিচ্ছেদ হয়।