Friday, May 29, 2015

এক ফরীদি ১৩ রকম

এক. মিতাহুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ একটা লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখার শুরুর অংশে লেখক হুমায়ূন তৎকালীন দৈনিক বাংলার সহ-সম্পাদক সালেহ চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, “তিনি (সালেহ চৌধুরী) আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘বাংলাদেশে পাঁচজন হুমায়ুন আছে। দৈনিক বাংলায় এদের ছবি একসঙ্গে ছাপা হবে। আমি একটা ফিচার লিখব, নাম পঞ্চ হুমায়ুন।আমি বললাম, ‘পাঁচজন কারা?’ সালেহ চৌধুরী বললেন, ‘রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, দৈনিক বাংলার সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুন, অধ্যাপক-কবি হুমায়ুন আজাদ, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং তুমি (হুমায়ূন আহমেদ)।’’ ট্র্যাজিক বিষয় হচ্ছে বর্তমানে পাঁচ হুমায়ুনের একজনও বেঁচে নেই।

দুই. ফরীদি মঞ্চে শেষবারের মতো অভিনয় করেন ১৯৯২ সালে। অনেকে জানেন, মঞ্চে নাটক করা তার পছন্দ ছিল না। তবে তিনি মঞ্চের তুখোড় অভিনেতা এটা কেউ অস্বীকারও করবেন না। মঞ্চে ফরীদির আনুষ্ঠানিক যাত্রা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃনাট্য প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। সেখানে নিজের লেখা নাটক আত্মস্থ ও হিরণ্ময়ীদের বৃত্তান্তনির্দেশনা দেন ও অভিনয় করেন। নাটকটি সেরা নির্বাচিত হয়। সে সুবাদে পরিচয় ঘটে ঢাকা থিয়েটারের নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে।

তিন. সিরিয়াস টাইপের রসিকতা করতে পারঙ্গম ছিলেন ফরীদি। এক সাংবাদিকের সঙ্গে তার কথোপকথন ছিল অনেকটা এ রকম
চলচ্চিত্রে কিভাবে এলেন?’
পরিচালক খোকনের (শহীদুল ইসলাম খোকন) সাথে।
প্রশ্নকর্তা শুধরে বললেন, ‘না মানে এফডিসিতে কিভাবে এলেন?’
ফরীদির উত্তর, ‘বেবিট্যাক্সি করে।

চার. শহীদুল ইসলাম খোকনের সন্ত্রাসসিনেমার মাধ্যমে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় শুরু তার। বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ককে ভিন্ন রকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন ফরীদি। তার সিনেমায় নায়কের চেয়ে খলনায়কের প্রতিই দর্শকের আকর্ষণ ছিল বেশি।


পাঁচ. ফরীদির প্রথম টিভি নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর নিখোঁজ সংবাদ। মজার বিষয় হল এ নাটকে তিনি প্রথমে অভিনয় করতে চাননি। কারণ স্ক্রিপ্ট পছন্দ হয়নি! একটি চ্যানেলের ওই যুগে বড় বড় অভিনেতারাও কোনো চরিত্রে অভিনয়ে মানা করার আগে দশবার চিন্তা করতেন!

ছয়. অভিনয়ের প্রথম দিকে ১০ বছর পর্যন্ত ফরীদি চাঁদপুর কর্পোরেশনে চাকরি করতেন। শুধু অভিনয় করে জীবন ধারণ সম্ভব ছিল না বলেই চাকরিটা ছাড়তে পারেননি। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছিলেন তিনি।

সাত. দেশ সম্পর্কে ফরীদি বলতেন, ‘দেশটা আরও সুন্দর হতে পারত। মুক্তিযুদ্ধ তার মাঝে আশাবাদের বীজ বপন করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে ৫ বছর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ছেদ ঘটে। পরে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আট. ফরীদি দিনে ৪-৫ বার ভাত খেতেন। এর পেছনে যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি আসলে অল্প আহার করেন। মানুষ তিনবেলায় যা খায়, তিনি অল্প অল্প করে ৪-৫ বারে তা খেতেন। তবে সবসময় যে ভাত খেতেন তা ঠিক নয়। আইটেম হিসেবে রুটি, সবজিও খেতে পছন্দ করতেন ফরীদি।

নয়. তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ফরীদিবানান নিয়ে। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ফরীদিলেখা সহজ বলেই তিনি শব্দটি এভাবে লেখেন। এ ছাড়া বিশেষ কোনো কারণ নেই। তার মায়ের নাম ছিল ফরিদা ইসলাম, সেখান থেকেই তার নামকরণ হয়েছে।

দশ. হুমায়ুন ফরীদির অনেকগুলো ডাকনাম। এর মধ্যে অন্যতম পাগলা, সম্রাট ও গৌতম।

এগারো. হুমায়ুন ফরীদি মৃত্যুনিয়ে বলতেন, মৃত্যু একটি ভয়ংকর সুন্দর ব্যাপার। কারণ মানুষের মনে মৃত্যুভয় থাকলে কেউ কখনও পাপের চিন্তা করতে পারে না। এখানেই মৃত্যুর সৌন্দর্য।

বারো. কথায় কথায় কৌতুক করতেন তিনি। তবে ফরীদি স্পর্শকাতর বিষয়-আশয় নিয়ে কৌতুক করতে পছন্দ করতেন। তার বন্ধু-মহলে এ্যাডাল্ট কৌতুকই বেশি বলতেন। সবাই হেসে মরে যাবার উপক্রম হলেও তিনি কখনোই হাসতেন না। আরেকটি বিষয় তিনি প্রায়ই করতেন। কাছের মানুষদের ভূতের ভয় দেখানো। এ কাজটা সফলভাবে করতে পারতেন।

তের. তরুণকালে বেলি ফুলের মালা দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে মিনুকে বিয়ে করেছিলেন ফরীদি। ব্যতিক্রমী এ বিয়ের ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। দেবযানি নামে এই দম্পতির একটি মেয়ে রয়েছে। পরে ফরীদি ঘর বাঁধেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে। ২০০৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। 

Sunday, January 4, 2015

নিউক্লিয়াস ১

মনের ভেতর কত প্রশ্নই তো উকি দেয়। উত্তর দেবে কে, বলুন? কার এত সময় আছে?
সবাই দৌড়ের ওপর। ৪৩ বছর আগে স্বাধীন হওয়ার পর সবাই ভেবেছিল দৌড়টা বুঝি শেষ হল। কোথায় কি... আগের থেকে আরও বেশি দৌড়াতে হয় সোনার বাংলার মানুষকে। পার্থক্য একটাই- আগে পেছনে হানাদার- রাজাকাররা থাকতো, আর এখন নিজ দেশেরই সোনার ছেলেরা থাকে।
ছোটবেলায় পাড়াতো এক আংকেলের আছে ইংরেজি প্রাইভেট পড়তাম। প্রতিদিন হেটে হেটে এসে উনি পড়িয়ে যেতেন। আর মাঝে মাঝে মন খুব ভাল থাকলে তাদের সুদিনের গল্প করতেন। মুক্তিযুদ্ধের গল্পও থাকতো সেখানে। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। পরবর্তীতে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে।
একজন মুক্তিযোদ্ধা, পরবর্তীতে সরকারি কর্মকর্তা- আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন ! ওই চাকরি ছাড়ার পর এটাই ছিল তার পেশা ! কিছুদিন আগে নিভৃতে নিজ বাসায় মারা গেছেন মানুষটা। এখন খারাপ লাগে, তার গল্পগুলো কেন সংগ্রহ করলাম না...
কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করলেও অভিযোগ ছিল না তার। দায়িত্ব তো পালন করেছেনই। দেশটাকে স্বাধীন তো করেছেন। এখন সেই দেশটাকে যদি আমরা সিভিলাইজড না করতে পারি, সূর্যসন্তানদের যদি আমরা সম্মান নাই দিতে পারি- দোষটা কার?
আর আজ যখন গাড়ি ভাংচুরের জন্য দেশের স্বনামধন্য একজন মিউজিশিয়ান বলে ওঠেন- "ফাক দিস হেল হোল... আম ডান উইথ ইট... " তখন আসলে কিছু বলার থাকে না। ৪৩ বছর ধরে আমরা কিন্তু এই হেল হোলেই বসবাস করছি। এবং আজ পর্যন্ত এই হেল হোল কেউই ক্লিন করেনি... দ্যাটস দ্য ফ্যাক্ট।
প্রথমে আগে বাংলাদেশের জন্মের গল্পগুলো জেনে নেই, তারপর দেখা যাবে কাদের জন্য আজ এই দেশ হেল হোল আর তাদের গল্প।
ভাল থাকুক আমার বাংলাদেশ।


Wednesday, May 29, 2013

হুমায়ুন ফরিদিঃ এক কিংবদন্তী

তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, "আপনি সিগারেট খান কেন ?" তিনি প্রতিউত্তর করলেন, "এনজয় করি, তাই ।" উপস্থাপিকা বললেন, "কিন্তু আপনি তো জানেন, ধূমপান খারাপ । তারপরও কেন করেন ?" একটুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, "মানুষ তো অনেক সময় জেনে শুনেও খারাপ কিছু করে । ক্ষতিকারক জেনেও খায় । আমার ব্যাপারটাও অনেকটা ওরকম ।

যিনি উত্তর দিচ্ছিলেন, তিনি হচ্ছেন বাংলা চলচিত্রের এক কিংবদন্তী, এক অবিসংবাদিত অভিনয় গুরু, হুমায়ুন ফরিদি । প্রশ্ন করছিলেন মুনমুন । হুমায়ুন ফরিদির জন্মদিনে বাংলাভিশনে প্রচারিত "আমার আমি" নামক একটি অনুষ্ঠানে ।

অভিনয় দিয়ে সমস্ত মানুষের মন জয় করা চাট্টিখানি কথা নয় । কিন্তু সে কাজটি অবলীলায় করে দেখিয়েছেন ফরিদি । খলচরিত্রে অভিনয় করেও মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন এমন অভিনেতা বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের মধ্যে হুমায়ুন ফরিদি অন্যতম । একজন অসাধারণ মানুষের হয়েও খুব সাধারণ জীবনযাপন, জীবন সম্পর্কে পরিষ্কার বোধ তাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে গিয়েছিল । নির্দ্বিধায় সবার সাথে মিশতে পারার গুণ সবার থাকেনা । হুমায়ুন ফরিদির সেই গুণ ছিল ।এসব কারণে অভিনেতা হিসেবে তো বটেই, মানুষ হিসেবেও হুমায়ুন ফরিদি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র । বলা যায়, একজন আইকন ।

নিজেই বলেছেন যে তার জীবন সম্বন্ধে অনেকের ভুল ধারণা আছে । সে ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিতেও চেয়েছিলেন । বলেছিলেন "প্রেমে পড়া" জীবনের সব চেয়ে মধুর উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম । নিজেও স্বীকার করেছেন, জীবনে বহুবার প্রেমে পড়েছেন । জীবনের শেষ দিকেও প্রেমে পড়েছিলেন, কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে চাননি । এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলেও বলেছিলেন হয়ত আমরা তাকে চিনি ।

বই পড়ার অনেক নেশা ছিল তার । কিংবদন্তীসম অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও অভিনয়ের বই পড়তেন সময় পেলে । খুব আনন্দের সময় গান গাওয়ার অভ্যাস থাকলেও, কবিতা আবৃত্তিও ভালোবাসতেন । জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকর্ষণ ছিল ।

নায়ক হিসেবে কেন অভিনয় করেননি এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, "আমার চেহারা নায়কের মত না । অত সুন্দর না । ওরকম উঁচা লম্বাও না । তাই নায়কের চরিত্রে অভিনয় করিনি ।"

ইচ্ছাকৃত ভাবে খলচরিত্রে অভিনয় কেন করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, "খলচরিত্রে অভিনয় করলে যা খুশি তা করা যায় । কিন্তু নায়ক চরিত্রে অভিনয় করলে করা যায় না ।"

বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা । সে কারণে দেশের বহু জায়গা ঘুরেছেন । ১৯৬১ সালে দিলিপ কুমারের এক ছবি দেখছিলেন এক হলে । নায়কের আবির্ভাব হলে মানুষ হাততালি দিত, শিস বাজাত । এসব দেখে হুমায়ুন ফরিদির মাঝেও ইচ্ছে জাগে অভিনেতা হওয়ার ।

টিভিতে অভিনয় করতে করতে খ্যাতির চূড়ায় উঠলেও, স্রেফ টাকার জন্য চলচিত্রে অভিনয়ে নামেন । এ তার নিজের কথা । জীবনধারনের জন্য টাকার দরকার । আর সে জন্যই চলচিত্রে অভিনয় । অভিনয় ছাড়া আর কিছু পারতেন না বলে মন্তব্য করেছিলেন এই অভিনয় গুরু ।

প্রাক্তন স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা সম্পর্কে কোন মন্তব্য বা প্রশ্নের উত্তর দিতেও একেবারে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন । কিন্তু বোঝা গিয়েছিল, নিজেকে মৃত্যুর আগে বড় বেশি একা বোধ করেছিলেন এই দিকপাল অভিনেতা ।

মৃত্যুকে ভয় নয়, বরং বরন করে নিতে বলতেন তিনি । তার মতে, জন্মিলে মরিতে হবেই । তাহলে এ অবশ্যম্ভাবীকে ভয় করে কি লাভ । মৃত্যুকে আনন্দের সাথে বরন করে নিতে বলতেন তিনি ।

আজ এই কিংবদন্তীর জন্মদিন ।

জয়তু হুমায়ুন ফরিদি ।

যেখানেই থাকুন না কেন, ভাল থাকুন ।    

       

Saturday, May 25, 2013

কাজী নজরুল ইসলাম

কবিতাকে বলা যায় সাহিত্যের সব চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমের মধ্যে একটি । ছন্দের আড়ালে মনের ভাব প্রকাশ করার, এর চেয়ে বড় আর কোন মাধ্যম নেই । বাংলা সাহিত্যেও দিকপাল অনেক কবি এসেছেন । তাদের মাঝে নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথকে সবার ওপরে রাখতেই হবে । আর রবীন্দ্রনাথের পরে যদি কাউকে রাখতেই হয়, সেটা নজরুল ।

১৮৯৯ সালে বর্ধমানে এক গরিব পরিবারে জন্ম নিলেও, ছোট বেলা থেকে কবিতা, গান, নাটক, অভিনয়, পালাগানের প্রতি নজরুলের ঝোঁক ছিল । ছোটবেলা থেকেই কবিতা, ছড়া, পালাগান, লেটগান রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত । কিছুটা অস্থির প্রকৃতির হলেও সচেতন ছিলেন দেশ-মাটি সম্পর্কেও । যার প্রমাণ আমরা পাই তাকে ১ম বিশ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেখে । কিন্তু তার প্রতিভার বিস্ফুরণ ছিল সবখানেই সমান । কোথাও তার বিন্দুমাত্র চ্যুতি ঘটেনি ।

তিনি কবিতাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যাবহার করেছেন । ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, সকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে তিনি কবিতাকে বানিয়েছেন অস্ত্র । রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ৩৮ বছরের ছোট হলেও, রবীন্দ্রনাথ তার অনুজ এই কবির আবির্ভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্তরিকভাবেই । রবীন্দ্রনাথ তার "বসন্ত" নাটিকাটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন, যখন নজরুলের বয়স মাত্র ২৩, এবং তিনি ছিলেন কারাগারে রাজদ্রোহের অপরাধে । সমসাময়িক অনেক সাহিত্যিক নজরুলের উত্থানকে স্বাগত না জানালেও, বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ যখন নজরুলকে উৎসর্গ করলেন তার নিজের রচনা, তখন নজরুলকে নিয়ে কারও মনে কোন সন্দেহ রইলনা । কারাগারে থাকার সময় অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ যখন নজরুল অনশন শুরু করলেন তখনও রবীন্দ্রনাথ নিজে নজরুলকে অনশন বন্ধ করার জন্য চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু সেই চিঠি পৌঁছায়নি । সমসাময়িক কবিদের মাঝে থেকেও নিজের এক আলাদা জগত তৈরি করেছিলেন নজরুল, যা আজও অক্ষুন্ন আছে । নজরুলের নিজের রচনাতে রবীন্দ্রনাথের প্রচুর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । তারপরও নজরুল আপন মহিমায় উজ্জ্বল, চির শাশ্বত ।

মাত্র ২০ বছরের সাহিত্যিক জীবনে নজরুল সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই নিজের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন । জীবনের শেষ দিকে বাক শক্তি হারিয়ে ফেললেও নজরুলের উপস্থিতিই অনেক কিছু ছিল ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এনে কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয় । ঢাকাতেই ১৯৭৬ সালে মারা যান এই বিদ্রোহী কবি ।

তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, তবুও তার গান, কবিতা... তার রচনা আজও আমাদের প্রেরণা যোগায় । তিনি আমাদের মাঝে জন্মেছিলেন বলে যে তিনি শুধু আমাদের, তা নয় । তিনি সকল দেশের, সকল মানুষের ।          

Wednesday, May 8, 2013

আমাদের রবীন্দ্রনাথ

নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক দিকপাল হলেন রবীন্দ্রনাথ । গান, কবিতা, উপন্যাস, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া, এমনকি চিত্র শিল্পেও তার ছিল অবাধ বিচরণ । বলতে গেলে সাহিত্যের প্রায় সব দিকে এরকম যুগান্তকারী প্রতিভা অতি বিরল । আজ এই অমর শিল্পীর জন্ম বার্ষিকী । আজ ২৫ শে বৈশাখ ।

কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর বাড়িতে জন্ম নেয়া এই প্রতিভার শিক্ষাগত যোগ্যতা না যতটুকু ছিল, তার থেকে বেশি ছিল তার স্বশিক্ষা । অনেকটা বলা যায়, বেগম রোকেয়ার সেই বাণীর মত, "সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত" ।

বাল্যকাল থেকে প্রতিভার স্ফুরণ, তারপর কিছুদিনের ভেতরেই বোদ্ধা সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ, কিন্তু হঠাৎ শিক্ষালাভের জন্য বিলেত গমন, তারপর শিক্ষা সমাপ্ত না করেই দেশে ফিরে আসা এবং সাহিত্যের প্রতি মননিবেশ করা । প্রথম এশিয়ান হিসেবে নোবেল জয়, নাইট উপাধি পেয়েও পরে বর্জন, অমর সব সৃষ্টির মাঝে বাংলা সাহিত্যকে পূর্ণতা দান ।

মহান এ সাহিত্যিকের জন্ম বার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধা ।

জয়তু রবীন্দ্রনাথ ।  



    
  

Monday, May 6, 2013

তৈরি পোশাক খাতঃ সাভার ট্র্যাজেডি ২০১৩

বিশ্ব ব্যাংকের মতে, পৃথিবীর সব চেয়ে সস্তা শ্রম বাজার বাংলাদেশ । যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে শ্রম মজুরি প্রায় ৬৫-৮৫ ডলারের মধ্যে, সেখানে বাংলাদেশে তার পরিমান মাত্র ৩৫ ডলার । সেজন্য বহু নামকরা ব্র্যান্ড তাদের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক বাংলাদেশ থেকে নেয় । 

আর আমাদের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর মালিকরা শ্রমিকদের কাছ থেকে তাদের কাজ আদায় করে নিলেও তাদের দিকে বিন্দু মাত্র ভ্রূক্ষেপ করার প্রয়োজন বোধ করেননা । যেখানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক আয়ের সিংহভাগ আসে এই তৈরি পোশাক খাত থেকে, এবং এর সাথে জড়িয়ে আছে প্রায় ৪০-৪৫ লক্ষ মানুষ, যাদের ভেতর সিংহভাগ আবার নারী শ্রমিক ।

কোনওমতে তৈরি করা কারখানা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, মুখোশের আড়ালে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে কাজ করতে হয় যাদের, তাদেরই তৈরি করা পোশাক সারা পৃথিবীর প্রশংসা পায়, আর এই শ্রমিকরা পায় আগের মতই বঞ্চনা । 

এসব কারনেই তৈরি পোশাক খাতের দুর্ঘটনাগুলো কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছেনা । আর এসব কারনেই বাংলাদেশ হারাচ্ছে ওয়ালমার্ট, ওয়ালট ডিজনি সহ নামকরা অনেক ক্রেতাকে । এছাড়াও পশ্চিমা ক্রেতাদের ওপর এমন চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে যে তারা শুধু নিম্ন শ্রমিক মজুরির জন্যই বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে যে এমন অবস্থা, সেদিকে দৃষ্টিপাত করেনি । কিছু কিছু গণমাধ্যমে এও শোনা যাচ্ছে যে, হয়ত বাংলাদেশের বাজার থেকে পশ্চিমা ক্রেতারা এখন শ্রীলংকা, ভারত, চীনের বাজারের দিকে বেশি ঝুকবে, মজুরির পরিমান বেশি হওয়া সত্ত্বেও ।

যদি সরকার এখনি এব্যাপারে আরও সতর্ক পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর ফল আমাদেরই ভোগ করতে হবে ।

তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে কিছু মতের বহিঃপ্রকাশ । 

# "মার্কিন বাজারে জি এস পি সুবিধা নিয়ে শুনানিতে সাভারের ঘটনা প্রভাব ফেলবে"  কথাটা বলেছিলেন ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডান মজেনা, আর দেশের একজন শীর্ষ দায়িত্বশীল বললেন, এই ঘটনা শুনানিতে কোন প্রভাব ফেলবে না । 

# দেশের আরেকজন শীর্ষ দায়িত্বশীল বললেন কিছুদিন আগে, সাভারের ঘটনা তেমন কিছুই নয় । প্রায় ৭০০ মানুষের জীবনাবসান তার কাছে কিছুই নয় ।

# ভবনটাকে নাকি ঝাঁকানো, ধাক্কা দেয়া হয়েছিলো, তাই ভেঙ্গে পড়েছে; বললেন আরেক দায়িত্বশীল ।

# রানা সরকারদলীয় কেউ নয়, বললেন দেশের শীর্ষ নির্বাহী । কিন্তু তারপরেই প্রমাণ হয়ে গেল রানা সরকারদলীয় নাকি না । 

# সারা দেশের মানুষের দাবির প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মামলা করা হল যে ধারায়, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ৫ বছর কারাদণ্ড । কিন্তু পরে জনদাবির মুখে রানার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হল ।

# ঘটনার আগেরদিন যে ইউ এন ও ভবনের ফাটল পরিদর্শন করতে এসে বলেছিলেন যে কাজ চলতে পারে, সমস্যা হবে না, তাকেই ঘটনার তদন্ত কমিটিতে রাখা হল সদস্য হিসেবে ।

তবে দেশের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, আশা করব খুব তাড়াতাড়ি শুভ বুদ্ধির উদয় হবে, উলটা পাল্টা কথা না বলে দেশের কল্যাণে কাজ করার একটু চেষ্টাও করবেন দায়িত্বশীলরা ।
   

হেফাযতের আন্দোলন- ৫ই মে ২০১৩

গত মাসে হেফাযতে ইসলাম বলে একটি সংগঠন বিভিন্ন দাবি নিয়ে ঢাকার মতিঝিলে সমাবেশ করে, এবং সারাদেশে আন্দোলনের ঘোষণা দেয় । তারা তাদের ১৩ দফা দাবি ৫ই মের মধ্যে মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়, অন্যথায় ৫ই মে তারা ঢাকা অবরোধ করবে বলে ঘোষণা দেয় । সে মোতাবেক গতকাল ৫ই মে, তারা ঢাকা অবরোধ করে, এবং পরে ঢাকার ভেতর ঢুকে পরে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করতে থাকে ।

কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন, বায়তুল মকাররামের মার্কেটের দোকান, আজাদ প্রোডাক্টস, আইডিয়াল প্রোডাক্টস, অথবা পল্টনের ফুটপাথের দোকান, রাস্তার আইল্যান্ড, গাছ, সাধারণ মানুষের গাড়ি, এসব কি দোষ করেছে ?

একজন পরিবহন শ্রমিক মারা গেছে গতকাল সকালে । এছাড়াও সারাদেশে বহু গাড়ি ভাংচুরের কারণে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে পরিবহন ধর্মঘট । সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে আরও ।

গতকাল রাতের দিকে পল্টনের বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও লুটপাটের চেষ্টা করা হয়েছে । স্বর্ণের দোকানগুলতেও লুটপাটের চেষ্টা করা হয়েছে ( একুশে টিভি) ।

বায়তুল মকাররামের দক্ষিন গেটে বেশ কয়েকটি দোকানে আগুন দেয়া হয়েছে, যে সব দোকানে ইসলামী বইসহ পবিত্র কোরআন শরীফ ছিল ।

আজ সকালে বিভিন্ন টিভির খবরের মতে, প্রায় ১৩ জন মারা গেছে ।

এ কোন ধরনের আন্দোলন ? যাতে মানুষের জীবন-জীবিকার কোন দাম নেই । পবিত্র কোরআন শরীফকে অবমাননা করা হয় । সাধারণ মানুষের ভেতর আতংক ছড়ানো হয় ?